Alekh

প্রায় তিন দশক আগের কথা। আমি তখন কাজের সূত্রে মুম্বাই থেকে কয়েকদিনের জন্যে রাজস্থানের যোধপুরে। মুম্বাইয়ে বর্ষামেঘের আনাগোনা শুরু হলেও যোধপুরে তখনও গ্রীষ্মের প্রকোপ কমেনি। একদিন পড়ন্ত বিকেলে একটা সাইকেল ভাড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে গিয়ে, পালি রোড ধরে এগোচ্ছিলাম।

বেশ কিছুটা চলে আসার পর লক্ষ করলাম, বাতাসের বেগ ক্রমশ বাড়তে শুরু করেছে। সঙ্গে উড়ছে বালি। আর ঘোলাটে আকাশও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি অন্ধকার হয়ে আসছে। অর্থাৎ ঝড় আসছে, সঙ্গে মেঘ। সুতরাং ফিরতে শুরু করলাম। কিন্তু সাইকেল চালানো দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে ঝড়ের দাপটে। শেষে রাস্তার ধারে একটি চায়ের দোকানে আশ্রয় নিলাম। ইটের পাকা দেয়ালের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি বোধ করলেও, বাইরে তখন বালিঝড়ের শোঁ-শোঁ শব্দে কেঁপে কেঁপে উঠছে পৃথিবী। মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছে আর আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে মেঘের চাপা গর্জন, যেন গুমরে গুমরে ওঠার সশব্দ প্রকাশ। ওই আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে আটকে পড়া আমার মতো আরও দু-একজন পথচারী, রাজস্থানি শ্রমজীবী পুরুষ-নারী, সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। আমি নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছি একপাশে। আর অনুভব করছি, এইসব মানুষের সান্নিধ্য থেকে বহুদূরে এক গভীরতর একাকিত্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। আর সেই একাকিত্ব থেকে উঠে আসছে একটি অস্পষ্ট গান– ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার…’। পরাণসখা এক বন্ধুর জন্যে প্রাণ আকুল করা আর্তি।

শুধুমাত্র প্রাকৃতিক ঝড়ের অনুষঙ্গে মনে পড়ে গেল ওই গান, এরকম ভাবলে একটু ভুল বোঝা হবে। কমবয়স থেকেই যেহেতু আমি রবীন্দ্রনাথের গানে বড় হয়ে উঠেছি, তাই স্বাভাবিকভাবেই রবীন্দ্রনাথের গান সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কিছু ভাব-ভাবনা, ভালো-লাগা কাজ করে। রবীন্দ্রনাথ যেসব পূজার গানে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবোধ সংরক্ত হয়ে থাকে, কিংবা যেসব প্রেমের গানে তাঁর ভাবনা ঘোরাফেরা করে পার্থিবতার মধ্যে, অথবা প্রকৃতির যেসব গান শুধুমাত্র প্রকৃতির বর্ণনা ও তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভবের মধ্যে সীমায়িত থাকে– সেসব গানের চেয়ে তাঁর পূজা, প্রেম বা প্রকৃতির যে-গানগুলি উপলব্ধির আলোছায়াঘন রহস্যময়তায় নিয়ে যায়, প্রাতিষ্ঠানিকতা বা পার্থিবতাকে অতিক্রম করে মনের কোনো ‘সমুন্নত বৃত্তি’-কে বিকশিত করে, হয়ে ওঠে আমার আত্মার, সমগ্র জীবনের প্রার্থনা, রবীন্দ্রনাথের সেই গানগুলি আমার নিরবচ্ছিন্ন সঙ্গী।

‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’ গানটি ‘গীতবিতান’-এ বর্ষা অর্থাৎ প্রকৃতি-পর্যায়ের গানে অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, এটি ‘গীতাঞ্জলি’র একটি সঙ্গীত। মনের ওই সমুন্নীত বৃত্তিকে যদি আমরা আধ্যাত্মিক বলি, তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়– ‘গীতাঞ্জলি’র এই ধরনের গানগুলি আমার আধ্যাত্মিক বোধকে প্রসারিত করেছে। নারী-পুরুষের প্রেমের অপূর্ণতা থেকে এক পূর্ণের সন্ধান এবং প্রাপ্তিও হয়ত-বা এইসব গান। পূর্ণতার পথে একাকী মানুষ যেমন পথিক, রবীন্দ্রনাথের গানে, ঈশ্বরও তেমনই পথিক। রবীন্দ্রনাথ যেখানে ঈশ্বরকে দেখছেন এবং ভালোবাসছেন মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে, সেইখানে ওই ঈশ্বর ও বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে প্রবাহিত তাঁর আলোকিত চেতনাপ্রবাহকে আমিও বুঝি আমার উপলব্ধিতে, তাকে অনুভব করতে পারি, গ্রহণ করতে পারি তাতে আমি প্রচলিত অর্থে ঈশ্বরবিশ্বাসী নাকি নিরীশ্বরবাদী, সে প্রসঙ্গ তুচ্ছ হয়ে যায়। পূর্বোক্ত ঈশ্বরই তো পরাণসখা, যার জন্যে গাওয়া হয়েছে, ‘আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে’। সেই ঈশ্বর, বৃহৎ মানবতার সত্তা, সে যেমন পথিক, তেমন সে-ই পথিক মানুষের সখাও– ‘পান্থ তুমি, পান্থজনের সখা হে’। তার চলার পথও সুগম নয়। জড় ও জীবপ্রকৃতির অলঙ্ঘ্য বিধান তার পথের বিঘ্ন। তাই পথিক ও তার পরমসখার মিলন বড় সহজসাধ্য নয়। তার জন্যে থাকে উদ্বেগ, থাকে সংশয়, থাকে বিরহের নিবিড়-নীরব হাহাকার।

একটি ঝড়বিক্ষুব্ধ সন্ধ্যায় রাজস্থানের একটি হাইওয়ের ধারে তুচ্ছ এক চায়ের দোকানের আবছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে অনুভব করছি সেই চিরবিরহের বেদনা। তখন বড়-বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নেমেছে। তৃষ্ণার্ত মাটির বুক থেকে উঠে আসছে অদ্ভুত এক সোঁদা গন্ধ। একসময় বৃষ্টি বৃষ্টি শুরু হলো জোরে। সত্যিই কি হতাশা-সম আকাশ কাঁদছে! এ তো এক চিরন্তন বিরহিনীর ভাষ্য– ‘দুয়ার খুলে হে প্রিয়তম, চাই যে বারে বার’। এ কি আমারও চিরজীবনের প্রতীক্ষা নয়! আমার মিলন লাগি কেউ কি আসছে না? কেউ কি আসবে না?
রবীন্দ্রনাথের গানে যতই দুঃখবেদনার কথা থাকুক, সেইসব বিষাদের অন্য পারে লেগে থাকে একধরনের স্নিগ্ধতার স্পর্শ, অশ্রুনদীর সুদূর পারেও ঘাট দেখা যায়, বিশ্ববিধানের প্রতি কোনো তিক্ততার অনুভূতি থাকে না, থাকে না কোনো কালিমা। তাই যে-রাতে দুয়ারগুলি ঝড়ে ভেঙে যায়, তখন ঝড় যে সেই পরমসখারই জয়ধ্বজা, তা না-জানার ফলে ত্রাসে শঙ্কায় অন্ধকার হয়ে ওঠে গাঢ়তর, দুঃস্বপ্নময়। কিন্তু সেই অন্ধকারের শেষে সকালবেলার আলোয় ঘরভরা শূন্যতার মধ্যে পরমকে পাওয়ার উপলব্ধিতে, বিস্ময়ে পূর্ণ হয়ে ওঠে জীবন। অর্থাৎ সমস্ত সঙ্কট ও বিপর্যয়ের পরেও আলোর গান শোনা যায়। নিজের অস্তিত্বের ভিতর আলোকিত চৈতন্য-প্রবাহের মধ্যে মানুষ খুঁজে পায় সেই পরম শক্তিকে।

মনে পড়ে গানটির পরবর্তী পঙক্তিগুলি– ‘বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই/ তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই।’ এ শুধু প্রকৃতিজগতের বা রাত্রির অন্ধকারের জন্য পথ দেখা যাচ্ছে না, তা তো নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, সৃষ্টি অপূর্ণ এবং তাকে পূর্ণ করে তোলার দায়িত্ব যেমন মানুষের, তেমনই সেই অপূর্ণতার দায় স্রষ্টারও। তাই সেই পূর্ণতার পথে চলেছে মানুষ ও তার পরম সত্তা। সেই পথ অনির্দেশ্যের, যার স্পষ্ট রেখা চোখে পড়ে না, তাই এই উদ্বেগ। সেই পথ অনন্ত দেশ-কাল জুড়ে প্রসারিত। সেইখানে অনন্ত বেদনা, সংশয় ও আকাঙ্ক্ষার আনন্দ পরস্পরকে ছুঁয়ে থাকে।

রবীন্দ্রনাথের যেসব গানে আনন্দ ও গোপন হাহাকার, পূর্ণতা ও নিবিড় বেদনার বোধ মিশে থাকে একই সঙ্গে, সেইসব গানে আমি একাত্মতা বোধ করি। কিশোর-বয়স থেকেই আমি এমন অনুভব করেছি, যদিও তখন তার কোনো ব্যখ্যা আমার কাছে স্পষ্ট ছিল না। এরকম অনুভব করার কারণ হয়ত ‘ডাকঘর’-এর অমল। আমি একদা অমলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। আমার বয়স বছর দশ-এগারো। রিহার্সাল করতে করতে বুঝতে পারছিলাম, ক্রমশ অমলের চরিত্রের ভিতর ঢুকে যাচ্ছি আমি। সেই প্রথম অনুভব করছি আমার প্রতিদিনকার চেনা-জীবনের ছোট গণ্ডির বাইরে ছড়িয়ে আছে কত বিচিত্র জীবন। অচেনা লোকালয়, পাহাড়, ঝরনা, সমুদ্র, তাদের অস্তিত্বকে আপন উপলব্ধির মধ্যে আবিষ্কার করছি। অমলের মতো আমিও যেন শুনতে পাচ্ছি এক দূর পথের ডাক। আমি ভাগ করে নিচ্ছি সেই অনন্যোপায় বালকের স্বপ্নকল্পনা, সমুদ্রের ধারে ক্রৌঞ্চদ্বীপ, নীল রঙের পাহাড়, পাখিদের দেশ। তার প্রতীক্ষা, রাজার চিঠি আসবে। সে দেখতে পাচ্ছে, রাজার ডাকহরকরা পাহাড়ের উপর থেকে একলা নেমে আসছে, পাহাড়ের পথ ঝরনার পথ বাঁকা নদীর পথ ধরে, কত রাতদিন সে একলা চলে আসছে। অন্ধকারে ঝিঁঝিঁপোকা ডাকছে, নদীর ধারে আর কেউ নেই, সে আসছে। সে-ই তো পরাণসখা বন্ধু, যার জন্যে গভীর মধ্যরাতে জেগে আছে উৎসুক বালকটি।

জীবনের ঝড়সঙ্কুল রাতে এই পরাণসখা বন্ধুরই তো অভিসার। তার জন্যই এত উৎকণ্ঠা, এত উদ্বেগ, এত ঔৎসুক্য– ‘সুদূর কোন্ নদীর পারে/ গহন কোন্ বনের ধারে/ গভীর কোন্ অন্ধকারে হতেছ তুমি পার’। তার জন্যেই তো জেগে থাকা– ‘নাই যে ঘুম নয়নে মম’।
‘আজি ঝড়ের রাতে’-র এই যে নৈরাশ্য-আকুলতা-সংশয়- আকাঙ্ক্ষা, তা সমগ্র জীবনমথিত, এই বিরহ সেই পরম সত্তার জন্য, এই আর্তি সেই পরম মিলনের, প্রেম যেখানে প্রার্থনায় সমুন্নীত। তবে এই গানে বিষাদ যতই প্রগাঢ় হোক, মিলনের সুদূর সম্ভাবনা একটি আশ্বাসও জাগিয়ে রাখে। ‘ডাকঘর’-এর অমলের মৃত্যুতে যেমন বিষণ্ণতা তৈরি হলেও, সে মৃত্যুকে ছুঁয়ে থাকে স্নিগ্ধতা ও পরম প্রশান্তি। আভাস থাকে যেন কল্পনার রাজাকে পাওয়ার। তাই এই মৃত্যুর মধ্যে জেগে থাকে এক রহস্যময় সৌন্দর্য। ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’-এ মৃত্যুর বিচ্ছেদ নেই, আছে পরমপ্রিয়র জন্যে বিরহবিধুরতা, আছে প্রতীক্ষা ও মিলনপ্রত্যাশা। আর আছে ইন্দ্রিয়াতীত প্রকৃতির সৌন্দর্য। 

ফিরে আসি রাজস্থানের সেই ঝড়ের সন্ধ্যার কথায়। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ঝড়বৃষ্টি থেমে গেলে আধো-অন্ধকার রাস্তায় নেমে এলাম। মাথার উপর বৃষ্টিভেজা শান্ত অন্ধকার আকাশ। বাতাসও তখন স্নিগ্ধ। কে বলবে কিছুক্ষণ আগে এই আকাশ-বাতাস জুড়ে কী প্রলয়কাণ্ড চলছিল! এই ঝঞ্ঝা, এই নিঃসঙ্গতা আর চরাচর-ব্যাপৃত বেদনার মধ্যে দিয়ে একা যেতে যেতে কেবলই মনে হচ্ছিল– গভীর কোন অন্ধকারে হতেছ তুমি পার…।

By Alekh

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *